
আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার চত্বরে ভয়াবহ সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আটজনের প্রাণহানি ও বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি মূলত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নিয়ম অমান্য করার প্রবণতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার গাফিলতির বহিঃপ্রকাশ। মুনাফার নেশায় জননিরাপত্তাকে বিসর্জন দিয়ে কীভাবে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা প্রকাশ্যে টিকে আছে, তা এই বিস্ফোরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
গ্যাস আইন–২০১০ ও গ্যাস বিতরণ বিধিমালা–২০১৬ অনুযায়ী, সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে শিল্পকারখানায় পরিবহন করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। পেট্রোবাংলার ভাষ্যমতে, এমন পন্থায় গ্যাস সরবরাহের কোনো অনুমোদন কখনোই দেওয়া হয়নি। অথচ দেশের বস্ত্র, পোশাক ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় দীর্ঘদিন ধরেই আইন অমান্য করে এই বিপজ্জনক পদ্ধতিতে গ্যাস নেওয়া হচ্ছে। আইন ও নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগের চরম অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই গড়ে উঠেছে এই অবৈধ বাণিজ্যচক্র। সিএনজি স্টেশন, প্রভাবশালী গোষ্ঠী, মধ্যস্বত্বভোগী ও কিছু অসাধু কারখানার মালিকের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক বিপজ্জনক সরবরাহব্যবস্থা। এখান থেকে প্রতিটি ঘনমিটার গ্যাসে বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। মানুষের জীবনের ঝুঁকিকে পুঁজি করে চলা এই লাভজনক ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কাদের প্রশ্রয়ে এটি চলছে, তা দ্রুত তদন্তের দাবি রাখে। আশুলিয়ায় প্রতিটি কাভার্ড ভ্যানে ৯০ থেকে ১০০টি উচ্চচাপের সিলিন্ডার বহন করা হচ্ছিল, যা ছিল রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বা জরুরি প্রতিরোধব্যবস্থার বালাই ছিল না।
বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে পাওয়া একটি সিলিন্ডারে ২০২১ সালের পর ব্যবহারের অযোগ্য মর্মে নির্দেশনা ছিল। পাঁচ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ একটি সিলিন্ডার কীভাবে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য এল, সেই প্রশ্নটি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে উচ্চচাপের গ্যাস পরিবহন চরম অবহেলা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধের শামিল। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা কারখানার সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকানি, সবজি বিক্রেতা ও পথচারীদের প্রাণহানি ঘটিয়েছে। অর্থাৎ, এই ব্যবস্থাটি আশপাশের জনপদের জন্যও একটি বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
উৎপাদনের প্রয়োজনে জ্বালানি সংকট মেটানো সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে এমন প্রাণঘাতী পথ বেছে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে দেশজুড়ে শিল্পকারখানায় সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি কারখানা ও সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করে কঠোর অভিযান চালানো জরুরি। বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই সুস্পষ্ট নীতিমালা, কারিগরি মানদণ্ড এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০