রাজনৈতিক উত্থানের ধারায় বাধার মুখে অবশেষে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হলো ইশরাক হোসেনকে। ৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেন বিএনপির প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুঁজি করে রাজপথ থেকে সংসদ সদস্য ও পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। তবে তার সংক্ষিপ্ত আট মাসের এই মন্ত্রীজীবনের ইতি ঘটল একটি বিতর্কিত ঘটনায়। প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা ইশরাক হোসেনের। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আট মাসের মাথায় ‘আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন কাণ্ডে’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হলো তাকে। এ ঘটনায় পল্টন থানায় করা মামলায় ইশরাক, আরেফি ও সারওয়ার্দীকে আসামি করা হয়। ওই সময় তার পাশে বসেছিলেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী। এই ঘটনায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে বিএনপি।
ঘটনার সূত্রপাত মাদকবিরোধী অভিযানের নামে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় ইশরাকের কর্মকাণ্ড ঘিরে। বলিউডের ‘দাবাং’ সিনেমার কায়দায় পিস্তল হাতে তাকে অপরাধী ধরার অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা সঙ্গীরাও সাধারণ মানুষকে লাথি মারা ও গুলি করার হুমকি দিচ্ছিলেন। জনসম্মুখে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে সরাসরি পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
ইশরাকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও পরে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে তিনি মেয়র হিসেবে ঘোষিত হন। তবে শপথ গ্রহণ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধের জেরে শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসা তার হয়নি। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হয়ে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে তরুণ নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফল চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াই শুরু করেন।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন ইশরাক।
২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পুলিশের লাঠিপেটার মুখে আহত এক কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনের ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে পুলিশের লাঠিপেটায় আহত এক কর্মীকে ছিনিয়ে নেন ইশরাক।
এছাড়া একই বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপদেষ্টা পরিচয় দেওয়া জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিয়া আরেফির সংবাদ সম্মেলনে পাশে বসে থেকে তিনি প্রশ্নের মুখে পড়েন। বাইডেনের কথিত উপদেষ্টাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের পর দলটির নয়াপল্টন কার্যালয়ে হাজির হন জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিয়া আরেফি। পরদিন বিমানবন্দর থেকে আরেফিকে আটক করে পুলিশ। দলটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, আরেফির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত নয়।
পরবর্তীতে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
২০২৫ সালের মে মাসে মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার দাবিতে তার সমর্থকরা নগর ভবন ঘেরাও করলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়, যা তার রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া একই বছরের ডিসেম্বরে জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি এবং কনুইগুঁতো ব্যবহারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি দলের সদস্যদের সঙ্গে না গিয়ে জামায়াত ও স্বতন্ত্রদের সঙ্গে শপথ গ্রহণ করে আলোচনার জন্ম দেন। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। একপর্যায়ে ফটকে তালা দেওয়া হলে জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়।
সংসদের বাইরেও তার কর্মকাণ্ড নিয়মিত চর্চার বিষয় ছিল। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময় তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে তিনিও স্যালুট দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। তবে এ বিষয়ে ইশরাক নিজের ফেসবুক পেজে সাফাই গেয়ে লেখেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুট দিয়েছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী ইশরাক প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন বিদেশে। পরে নিজের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করে ইশরাক লেখেন, লাঠিচার্জ কিংবা কামানের গোলা—যে পরিস্থিতিই আসুক, জীবন থাকতে দলের কোনো কর্মী-সমর্থককে নিয়ে যেতে দেবেন না।
সম্প্রতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি বিতর্কে জড়ান। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা অভিযোগ তুললে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। ইশরাক পরিস্থিতি ঠান্ডা না করে উল্টো বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে তীর্যক মন্তব্য করেন। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এদিকে সমসাময়িক অন্য কিছু ঘটনার মধ্যে আলোচনায় রয়েছে অপর্না ঘোষের পূজা উপলক্ষে নয় দেশ ভ্রমণের সংবাদ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শাস্তি পাওয়ার খবর। পূজায় ৯ দেশ ঘুরতে বেরিয়েছেন অপর্ণা ঘোষ।
এছাড়া সৌদি আরবের দেওয়া বন্দি তালিকায় ২ জন বাংলাদেশির নাম থাকলেও সেখানে তাদের মৃত্যুদণ্ডের কোনো তথ্য ছিল না বলে জানা গেছে। পরিশেষে, ইশরাকের রাজনীতিতে উত্থান, বিতর্ক আর মন্ত্রিত্বের বিদায় নিয়ে তৈরি এই ‘ইশরাকনামা’ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে একের পর এক বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তার। পুরান ঢাকায় তার শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন ইশরাক। ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দিয়ে কঠোর অবস্থান নেন।






