
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকর ৭৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গোয়ার নিজ বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিনেতার ছেলে মালহার পাটেকর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বর্তমানে গোয়াতে অবস্থান করছেন এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দেবেন বলে জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে স্মরণ করছেন অনেকে। ফিরে আসছে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের দৃশ্য, জনপ্রিয় সংলাপ ও অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতি।
নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্য দিয়ে। কিশোর বয়সে জীবিকার তাগিদে মাত্র ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন তিনি। কলেজ জীবনে রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকে উপার্জন করতেন ১৫ টাকা। রিডার্স ডাইজেস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কষ্টের সঙ্গে একাত্ম হতে শিখিয়েছে। পরবর্তীতে 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর', 'অগ্নিসাক্ষী' ও 'ওয়েলকাম'-এর মতো অসংখ্য চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয়ের দক্ষতা ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। অভিনয় জীবনে তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী সম্মাননা অর্জন করেছেন। খ্যাতি, অর্থ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সবই পেয়েছেন। কিন্তু ভুলে যাননি অভাবের দিনগুলোর কথা। জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন।
সফলতার শিখরে পৌঁছালেও নানা পাটেকর নিজের সাধারণ জীবনযাপন ধরে রেখেছিলেন। মুম্বাইয়ের সাধারণ ফ্ল্যাটে বসবাস এবং বিলাসবহুল জীবনবিমুখতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। ব্যক্তিগত জীবনে অর্জিত সম্পদের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করতেন অসহায় কৃষকদের কল্যাণে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাঁদের আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে আনা ছিল তাঁর অন্যতম ব্রত।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে যৌথভাবে 'নাম ফাউন্ডেশন' প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুসারে, এই সংগঠনের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রে ২ হাজার ২৪৬টি পানির উৎস পুনরুদ্ধার এবং ১৭৮টি নদী পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এছাড়াও ২ হাজার ৬৪১ জনের বেশি কৃষক বিধবা নারীর সহায়তায় কাজ করেছে ফাউন্ডেশনটি। এ সকল মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে ৭৭ লাখের বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিজের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই তিনি দাতব্য কাজে ব্যয় করতেন।
কৃষক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক সমর্থনের গুরুত্বও অনুধাবন করতেন এই অভিনেতা। ২০১৮ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কৃষকদের শুধু আর্থিক সহায়তা দিলেই হয় না, তাঁদের মানসিক শক্তি জোগানোও জরুরি। গত ২০২৬ সালের মে মাসে নাগপুরে পানি সংরক্ষণবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, লোকদেখানোর জন্য নয়, বরং ভেতর থেকেই পানি সংরক্ষণের তাগিদ অনুভব করতে হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও মহারাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে গড়চিরোলি অঞ্চলে গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন একটি প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিল তাঁর ফাউন্ডেশন।
তারকার জাঁকজমক বা প্রচারের চেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি দীপাবলির আনন্দের চেয়েও বড় মনে করতেন। অভিনয়ের জাদুতে দর্শককে বিমোহিত করা নানা পাটেকর পর্দার বাইরের জীবনেও এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্র অঙ্গনসহ সারা ভারতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাই পর্দার বাইরেও গড়ে তুলেছিলেন অন্য এক পরিচয়। সেই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পর্দার বাইরের মানুষটির জীবন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০