
একটি আধুনিক, স্বনির্ভর ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। আর পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিস্তম্ভ হলো মাধ্যমিক শিক্ষা। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কৌশলগত ত্রুটির কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষাবিদ শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমীর মতে, বর্তমান বাস্তবতায় একটি আধুনিক, টেকসই, বিজ্ঞানমনস্ক ও উৎপাদনমুখী জাতীয় শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
অতীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৌশলগত ত্রুটি, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমন্বয়হীনতা ছিল স্পষ্ট। বিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে উচ্চশিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মমুখী দক্ষতা ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষার ঘাটতি থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা সনদ নির্ভর হয়ে পড়তে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বর্তমান কাঠামোর বাইরে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যা পরিকল্পনা, তদারকি ও শিক্ষক ব্যবস্থাপনায় গতি আনবে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সিইএফআর (CEFR) কাঠামোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় জাপানিজ, জার্মান, আরবি বা স্প্যানিশের মতো বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখা প্রয়োজন।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না করলে তার সামনে বিকল্প শিক্ষাপথ অনেকটা রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। নতুন কারিকুলামে মূল্যায়নকে আরও নমনীয় ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করা প্রয়োজন। নদীভাঙন, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিশেষ উপবৃত্তি ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত ল্যাব ও ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। বিশ্বমানের কারিকুলাম তৈরি করলেও তা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন যোগ্য, প্রশিক্ষিত ও উদ্বুদ্ধ শিক্ষক। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, পদোন্নতি, বদলি ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য একটি স্বাধীন বা স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক। উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো নিশ্চিত না করে কেবল কারিকুলাম পরিবর্তন করে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ইউনেসকোর এডুকেশন ২০৩০ কাঠামোয় শিক্ষায় জিডিপির ৪-৬ শতাংশ অথবা সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশকে একটি বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশকেও ধাপে ধাপে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ তার বিপুল মানবসম্পদকে দক্ষ, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারবে। লেখক শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী, যিনি ঢাকা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক, মনে করেন, শিক্ষা নিয়ে যেকোনো সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সংস্কার সম্পন্ন করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তবতাবিবর্জিত কারিকুলাম চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারের শিক্ষাবিষয়ক নির্বাচনী ইশতেহার মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দূরদর্শী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপই হওয়া উচিত মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলামের বাস্তবভিত্তিক সংস্কার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাক্রম, যা একদিকে বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক তৈরি করবে, অন্যদিকে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি কিছু ক্ষেত্রে পরিমার্জন করা হলেও মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেকের কাছে জটিল ও অস্পষ্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং কোচিং ও গাইড বই নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি যুগোপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো ও আধুনিক কারিকুলামের আওতায় আনতে না পারলে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০