
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—অর্থাৎ মাত্র ২৭৩ দিনে—মোট ৪ হাজার ৬০টি মৃতদেহ দেশে আনা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনেরও বেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জনের মরদেহ দেশে এলেও, মহামারির পর থেকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায় এসে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান। মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়।
মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। পাবনার আল আমিনের ঘটনাটি এর অন্যতম উদাহরণ। কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কর্মরত অবস্থায় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে ১২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে তিনি মারা যান। কিন্তু আইনি জটিলতা এবং দূতাবাসের অনুপস্থিতির কারণে তাঁর মরদেহ দেশে আসতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়।
নিহত প্রবাসীর স্বজন ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, সংশ্লিষ্ট দেশে দূতাবাস না থাকলে বা কর্মী অনিয়মিত হলে মরদেহ শনাক্তকরণ ও দেশে আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির হয়ে পড়ে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসে, যার শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। প্রতিবছর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে অল্প বয়সী কর্মীদের মৃত্যুহারও দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বিলম্ব করা উচিত নয় এবং অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া। ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ হাজার ১৬৬টি মৃত্যুর মধ্যে ২০ শতাংশই ঘটেছে কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৪৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ বছরের প্রথম ৯ মাসে মৃতদের মধ্যে ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ ‘স্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাজনিত কারণে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড তাপমাত্রায় দীর্ঘসময় কাজ করা এবং প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রবাসীদের অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন গবেষকরা। তীব্র তাপ ও সূর্যালোকে কাজ করার ফলে কিডনি, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা কর্মক্ষমতা ও আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে বিএমইটির মাধ্যমে যে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা পর্যাপ্ত নয়। কর্মপরিবেশ ও চাপ সামলানোর কৌশল সম্পর্কে আরও কার্যকর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে এবং মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনার প্রক্রিয়ায় গতি আনা হয়েছে। অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তবে অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশের মাটিতে কর্মীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়সারা মন্তব্য পরিবারের জন্য অসম্মানজনক।
মরদেহ দেশে আনার পর ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রতিটি পরিবারের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দাফন খরচ এবং ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করে। এ বছর প্রথম ছয় মাসে দাফন খরচে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিমাসুবিধা এবং বকেয়া পাওনা বাবদ প্রায় ১১৯ কোটি টাকা আদায় করে দিয়েছে বোর্ড। তবে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, সরকারি এসব সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘ জটিলতায় অনেক পরিবার সহায়হীন হয়ে পড়ে। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়েছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিরাপত্তা সচেতনতা ও স্থানীয় আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। একইসাথে কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানোর কৌশল নির্ধারণ সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০