
নওগাঁর মান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের ভ্যানচালক আফছার আলীর বাড়িতে সেদিন ছিল অন্যরকম উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে আলোকসজ্জা, ফটক আর আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হয়েছিল আফসানা মিমি (২০) নামের এক তরুণীর বিয়ের। কনের বাবা আফছার আলী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান, তাই মেয়ের বিয়ের ব্যয়ভার বহন করা তাঁর জন্য অসম্ভব ছিল। অথচ এই অসাধ্য সাধন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের এক ব্যবসায়ী রুহুল আমিন। বর নাটোর সদর উপজেলার সবুজ মণ্ডলের ছেলে কাউছার মণ্ডলের (২২) সাথে মিমির বিয়ের যাবতীয় আয়োজন ও খরচ এককভাবে বহন করেছেন রুহুল আমিন। জরাজীর্ণ বসতবাড়িতে চলছে বিয়ের আয়োজন। পাশেই শামিয়ানার নিচে খাবারের জন্য সারি সারি চেয়ার টেবিল। তাঁদের এই বিয়ের আয়োজন আর দশটা সাধারণ বিয়ের মতোই। অর্থাভাবে মেয়ের বিয়ের উদ্যোগ নিতে পারছিলেন না।
রুহুল আমিনের কাছে এটি কেবল মানবিক কাজ নয়, বরং নেশার মতো একটি ব্রত। গত ২৪ বছরে তিনি এভাবেই ১১৩ জন হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছেন। কনে আফসানা মিমি জানান, বিয়ের কথা ভেবে তাঁর পরিবার যখন দিশেহারা, তখন প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি রুহুল আমিনের সন্ধান পান। তিনি বলেন, সমাজে এমন মানুষ থাকতে পারে, তা আগে কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। একইভাবে বর কাউছার মণ্ডল বলেন, রুহুল আমিন তাঁর বিয়ের উকিল বাবা হয়ে মেয়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, যা সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। গত ২৪ বছরে তিনি আরও ১১২ জন হতদরিদ্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
নিজে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা করা রুহুল আমিন বলেন, এই পৃথিবীতে মানুষ বিভিন্ন শখে অর্থ ব্যয় করে, আমার শখ অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়া। এর বিনিময়ে আমি কিছুই চাই না, সৃষ্টিকর্তার কাছেই প্রতিদান আশা করি। এই ১১৩ জন মেয়েকে তিনি নিজের সন্তানের মতো দেখেন। অনেক বিয়ের ভিডিও ও ছবি তিনি পরম মমতায় সংরক্ষণ করে রেখেছেন। বিয়ে উপলক্ষে আনন্দ উল্লাস করছেন স্বজনেরা।
তাঁর এই মহৎ কাজের ধারাবাহিকতায় গত ২১ আগস্ট ১১৩তম বিয়ের আগে ১১২তম বিয়ে হয়েছিল রাজশাহীর চারঘাটের বালাদিয়া গ্রামে সুমাইয়া আক্তারের। সুমাইয়া জানান, ১০ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর চরম অনিশ্চয়তায় বেড়ে ওঠা তাঁর বিয়ের খরচ বহন করে রুহুল আমিন তাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এছাড়া চলতি বছরের ২১ জুন ১০৯তম বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতি গ্রামের রাবেয়া খাতুনের। বাবা ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর আর্থিক সংকটে পড়া রাবেয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন করেছিলেন রুহুল আমিন। রাবেয়া ও তাঁর পরিবার আজও কৃতজ্ঞতার সাথে রুহুল আমিনের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম জানান, ওয়ালিয়া বাজারের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের বিয়ের সাক্ষী থেকে নিজেই সমস্ত খরচ বহন করেন। কাবিননামাতেও তিনি সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। তাঁর এমন ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, রুহুল আমিনের মানবিক কর্মকাণ্ড সমাজের বিত্তবানদের জন্য বড় একটি উদাহরণ। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি মনে করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০