দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র কক্সবাজারে মৎস্য আহরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় মোট ৫ হাজার ৫২৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। অথচ পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই উৎপাদন কমে ৪ হাজার ৩৯১ দশমিক ৩৫৯ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ১৩১ দশমিক ৭৪১ মেট্রিক টন বা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ সামুদ্রিক মৎস্যাঞ্চল কক্সবাজারে এক বছরের ব্যবধানে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ২১ শতাংশ কমেছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হচ্ছে, যা ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননচক্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে 'ক্লাইমেট জার্নাল'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা, পিএইচ মান এবং বৃষ্টির পরিমাণের সঙ্গে ইলিশের প্রজনন অঙ্গের পরিপক্বতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিবেশগত উপাদানগুলোতে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে মাছের প্রজনন সফলতার হার কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ঘন ঘন বৈরী আবহাওয়া ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে আরেকটি বড় কারণ। পলি জমে উপকূলীয় নদী ও চ্যানেলগুলো অগভীর হয়ে পড়ায় সমুদ্র থেকে ইলিশের উজানে আসার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, নদী ও খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা কমে যাওয়ায় প্রজননক্ষেত্রগুলো স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ার পরিবেশ হারাচ্ছে। তারেকুর রহমান, কক্সবাজার ||। জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি সমুদ্র, মোহনা ও নদীর পানির মধ্যে চলাচল করে। বিশেষ করে প্রজননের সময় উপযুক্ত পরিবেশের সন্ধানে বঙ্গোপসাগর থেকে নদী ও মোহনা অঞ্চলে আসে। মৎস্য গবেষকদের মতে, নদী ও মোহনার ভৌত বৈশিষ্ট্যের এমন পরিবর্তন ইলিশের ঐতিহ্যগত বিচরণপথ ও প্রজননক্ষেত্রকে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য করছে। বিভিন্ন গবেষণায় গত কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ জলভাগে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং প্রজননক্ষেত্র নিম্ন মোহনা অঞ্চলের দিকে সরে যাওয়ার প্রবণতার তথ্যও পাওয়া গেছে।
উৎপাদন হ্রাসের পেছনে অতি আহরণকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজারে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি নিবন্ধিত ট্রলার মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত রয়েছে, যা মৎস্য সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, অকাল ও অপরিকল্পিত আহরণের ফলে জাটকা বা ছোট ইলিশ নিধন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।
উপকূলীয় জেলেদের জীবিকাতেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। উখিয়ার ইনানী এলাকার জেলে নুরুল করিম জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ম মেনে মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও, সাগরে জাল ফেলে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। একই ধরনের শঙ্কার কথা জানালেন শহরের নুনিয়ারছড়ার জেলে সাইফুল আমিন। তিনি বলেন, সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছ ধরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, একটি পূর্ণবয়স্ক মা ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। তাই এই মাছ রক্ষা করা জাতীয় অর্থনীতি ও মৎস্য সম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশের প্রধান প্রজনন সময়কে সামনে রেখে মা মাছকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মৎস্য বিভাগ বলছে, ইলিশের উৎপাদনে এমন পতন শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি উপকূলীয় জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থার পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধুমাত্র বার্ষিক নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর না করে নদী ও মোহনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, দূষণ রোধ করা এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। মো. নাজমুল হুদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও মৎস্য আহরণে দায়িত্বশীল আচরণই ইলিশের মজুদ টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।
দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পরিবেশ সংরক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা এবং জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে পরিবারের জীবিকা এই মাছের ওপর নির্ভরশীল, তাই তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমানভাবে প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০