আইনের প্রয়োগে দ্বিচারিতা কেন? সাধারণের দুর্ভোগ ও প্রতিকারের উপায়

প্রকাশ:
Print news

বর্তমানে দেশে চুরি, ছিনতাই, ভাঙচুর, জমি দখল এবং মব-আচরণের মতো উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও অশ্লীলতার প্রবণতা। এসব কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জনজীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত ঘটছে জমি দখল বা পুরনো জমি ফিরে পাওয়ার দাবিতে সংঘাতের ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের সম্পদ দখল করছে, যা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হলেও প্রকৃত অপরাধীরা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, নদীভাঙনকবলিত মানুষদের অসহায়ত্ব এক করুণ বাস্তবতা তৈরি করেছে। যমুনার তীরে আলমডাঙ্গার মতো গ্রামগুলোতে মানুষ বারবার ভিটাহারা হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, ভাঙনের কারণে কারও বাড়ি ১৬ বার, কারও ২০ বার, আবার কারও ২১ বার পর্যন্ত ভেঙেছে। এই মানুষগুলো নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অথচ তাদের এই ভয়াবহ সংকট নিয়ে নীতিনির্ধারক বা রাজনৈতিক নেতাদের তেমন মাথাব্যথা দেখা যায় না। তারা নিয়মিত কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও নদীতীরের এই গ্রামগুলো মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানের একটি প্রতিবেদনের জন্য যমুনা নদীর তীরে আলমডাঙ্গা বলে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। নদীভাঙনকবলিত মানুষদের দুঃখ আর অসহায়ত্ব দেখে ভীষণ কষ্ট লেগেছে। একাধিকবার ভিটাহারা মানুষ নদীতীরে বসে বসে দেখছেন নদীর স্রোত। ‘আমরা কি খাসজমি চাইছি, নিজের জমিই তো চাইছি’। এমনিভাবে বহুবার ভিটাহারা হয়েছেন যমুনাতীরের এই মানুষগুলো। নিজের বসতভিটা হারানো মরিয়ম বিবি বললেন, ‘ভেবেছিলাম আমার ভিটাতেই মরমু, কিন্তু যে হারে ভিটা ভাঙতাছে, এহন কোন ভিটায় যে মরমু জানি না।’।

নদীর ভাঙন কোনো আইন বা বিধি দিয়ে আটকানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সহানুভূতি ও কার্যকর উদ্যোগ। এই বাস্তুহারা মানুষেরা অন্যের জমি দখল করেন না, বরং ভাঙনের কবলে পড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নেন। আশ্রয়দাতা মানুষগুলোও তাদের মানবিক কারণে জায়গা করে দিচ্ছেন। এসব সহজ-সরল মানুষের জীবন থেকে আমাদের নৈতিকতার অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

আমাদের সমাজের মূল সমস্যা হলো আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব। আইন প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে যখন হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, তখন আইনের ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। আমাদের দেশে আইনকে প্রায়ই একটি খণ্ডিত কাগজের টুকরোয় পরিণত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আইন রক্ষাকারীরাই অনেক সময় আইন ভাঙেন। ট্রাফিক আইন অমান্য করা থেকে শুরু করে ঘুষ লেনদেন করা যেন সমাজে এক প্রকার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দিনদুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে কারও সম্পদ ও নিরাপত্তার ওপর এ ধরনের আঘাত কারোই কাম্য নয়।

বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থার একটি বড় কারণ হলো আইনের প্রয়োগে দ্বিচারিতা। দুর্বল ও সাধারণ মানুষের জন্য আইন অত্যন্ত কঠোর হলেও প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবানদের জন্য তা অনেক ক্ষেত্রে শিথিল। এই অসম আচরণ অরাজকতার প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। অপরাধী যে দলের বা যে পেশারই হোক না কেন, কঠিন শাস্তির আওতায় না আনলে অপরাধের মাত্রা কমবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানহানি বা মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির রয়েছে। যেমন, অস্কারজয়ী অভিনেতা জেফ্রি রাশের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে পপ তারকা কার্ডি বি-কে চরিত্রহননের দায়ে ইউটিউবার তাশা কে-র বিরুদ্ধে মামলা করার পর ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের দেশে আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে এসব অপরাধের বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমাতে অনেক সময় কঠোর নিয়ম বা বিধিনিষেধ চাপানো হয়, যা উল্টো দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে। নিয়ম যত জটিল হয়, ঘুষের চাহিদা তত বাড়ে। ফাইল আটকে রেখে মানুষকে হয়রানি করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে সেবাকে সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো বিষয়গুলো জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজকে অস্থির করে তুলছে। তাই আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে এই বিশৃঙ্খলা রোধ করা এখন সময়ের দাবি। নিয়ম যেন হয় সেবার মাধ্যম এবং আইন যেন প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে—জনগণের এটাই প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন
শিরোনাম :
স্লো ওভার-রেটের শাস্তি পেল ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলার হুমকি, নিরাপত্তা জোরদার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৫৩৮ পদে নিয়োগ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে কোয়েল মল্লিক, দলবদল নিয়ে কী বললেন আইনের প্রয়োগে দ্বিচারিতা কেন? সাধারণের দুর্ভোগ ও প্রতিকারের উপায় শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত হলেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল: প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসায় নোবেল জিতলেন কার্ল ডাইসেরথ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ছাড়াল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মামলা দিনাজপুরের হাকিমপুরে ২২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক শ্রীলঙ্কার কাছে শেষ বলে হারলো জুনিয়র টাইগ্রেসরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিচার চাইল ডুজা বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ১৪২ পদে কর্মী নিয়োগ ইতালির লুক্কা উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পেল রেজওয়ান সুমিতের কর্মসংস্থানের দাবিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামনে প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েটদের টেকসই গণতন্ত্রের জন্য নারী অংশগ্রহণ অপরিহার্য: সিইসি শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা ডেলিভারির ফাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে প্রশংসিত উগান্ডার মনসুর হাসানুল হক ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ বাংলাদেশের হাইকমিশনারের স্লো ওভার-রেটের শাস্তি পেল ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলার হুমকি, নিরাপত্তা জোরদার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৫৩৮ পদে নিয়োগ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে কোয়েল মল্লিক, দলবদল নিয়ে কী বললেন আইনের প্রয়োগে দ্বিচারিতা কেন? সাধারণের দুর্ভোগ ও প্রতিকারের উপায় শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত হলেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল: প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসায় নোবেল জিতলেন কার্ল ডাইসেরথ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ছাড়াল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মামলা দিনাজপুরের হাকিমপুরে ২২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক শ্রীলঙ্কার কাছে শেষ বলে হারলো জুনিয়র টাইগ্রেসরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিচার চাইল ডুজা বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ১৪২ পদে কর্মী নিয়োগ ইতালির লুক্কা উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পেল রেজওয়ান সুমিতের কর্মসংস্থানের দাবিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামনে প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েটদের টেকসই গণতন্ত্রের জন্য নারী অংশগ্রহণ অপরিহার্য: সিইসি শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা ডেলিভারির ফাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে প্রশংসিত উগান্ডার মনসুর হাসানুল হক ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ বাংলাদেশের হাইকমিশনারের