
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় এ বছর সুপারির বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, লবণাক্ত বাতাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত গরমের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি জয় করে কৃষকদের সচেতনতা এবং নিয়ম মেনে বাগানের সঠিক পরিচর্যার কারণে গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ও কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নিয়ম মেনে বাগানের যত্ন নেওয়ায় ফলন বাড়ার পাশাপাশে বেড়েছে সুপারির গুণগত মানও। এদিকে ফলন বাড়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও।
কৃষি বিভাগের আধুনিক পরামর্শ মেনে স্থানীয় সুপারি চাষিরা নিয়মিত বাগানের দেখভাল করছেন। গাছের বয়স এবং চাহিদা অনুপাতে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও পচা গোবরের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বোরন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি বা খরা থেকে বাগান বাঁচাতে অগ্রিম ব্যবস্থা নিচ্ছেন চাষিরা। ফলে উৎপাদিত সুপারির সার্বিক গুণগত মান ও আকৃতি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। চাষিরা জানান, পূর্বে নানা আবহাওয়াগত সমস্যাকে মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে তা না জানায় ফসল কম হতো। এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়ার কথাও জানিয়েছে ন তারা।
উখিয়ার সোনারপাড়া এলাকার চাষি মিজানুর রহমান বলেন, “আমি চার কানি (৪০ শতকে ১ কানি) জমিতে সুপারি চাষ করেছি। এবার ভালো ফলন হয়েছে। আরো দেড় কানি জমিতে চারা রোপণ করেছি। আগে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা ও লবণাক্ততার কারণে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তবে এখন কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত সার প্রয়োগ, সেচ ও বাগানের যত্ন নেওয়ায় ফলন ভালো হচ্ছে।”
টেকনাফের জাহাজপুরা এলাকার সুপারি চাষি ইরফান আজাদ জানান, প্রতিবেদন ও কৃষি বিভাগের দিকনির্দেশনা তাদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। তার ভাষায়, “ একটি প্রতিবেদনে আবহাওয়া-সহনশীল সুপারি চাষের নিয়ম ও পরিচর্যার বিষয়ে জেনেছি। সেখানে যেসব পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলো থেকে উপকৃত হয়েছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সঠিক নিয়মকানুনগুলো তিনি অন্য চাষিদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
স্থানীয় পরিমাপের তথ্য প্রকাশ করে চাষি ইরফান জানান, এক পনে ৮০টি সুপারি থাকে এবং ১৬ পনে তৈরি হয় এক হন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ভালো মানের সুপারি এক হন বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে সাধারণ মানভেদে এক পন সুপারি বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। তবে গুণগত তারতম্যে কিছু সুপারি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়ও বেচাকেনা হতে দেখা যায়।
টেকনাফের সুপারি ব্যবসায়ী আবদুল মাবুদ জানান, উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগৃহীত সুপারি মান অনুযায়ী বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন বড় জেলায় বাজারজাতকরণের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ভালো মানের সুপারির বৈশ্বিক চাহিদাও বেশ সন্তোষজনক হওয়ায় তারা উপযুক্ত মূল্যে কেনাবেচা করতে পারছেন।
টেকনাফের শামলাপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক উদ্দিন জানান, সুপারি চাষে আশানুরূপ ফলন নিশ্চিত করতে দেড় হাত গভীর ও ৪-৫ হাত দূরে গর্ত করে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগের নিয়ম রয়েছে। গাছ বড় হওয়ার সমান্তরালে সারের মাত্রা বাড়াতে হয়। বিশেষত, ২-৩ বছর পর পর প্রতি গাছের গোড়ায় এক চা-চামচ বোরন দিলে সুপারি ফেটে নষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা যায়। সার প্রয়োগের আগে-পরে নিয়মিত সেচ দেওয়া এবং বাগান আগাছামুক্ত রাখলে গাছের জীবনীশক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সার প্রয়োগের আগে ও পরে পানি দেওয়া এবং আগাছা পরিষ্কার রাখা জরুরি।
টেকনাফ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুপারি চাষ হয় সাবরাং ইউনিয়নে (৩৭০ হেক্টর)। এছাড়া বাহারছড়ায় ৩৬০ হেক্টর, টেকনাফ সদরে ৩৫০ হেক্টর, হ্নীলায় ৪০ হেক্টর, হোয়াইক্যঙে ৫০ হেক্টর ও সেন্ট মার্টিনে ১০ হেক্টর বাগান রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, উপজেলায় ১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ১ হাজার ২৬০ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতি হেক্টরে খোসাসহ সুপারির গড় উৎপাদন ১৩ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন এবং খোসা ছাড়ানো শুকনা সুপারি ৫ দশমিক ৫ মেট্রিক টন।” সে হিসাবে উপজেলাটিতে মোট ১৬ হাজার ৯২২ মেট্রিক টন খোসাসহ এবং ৬ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন শুকনা সুপারি উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। গত মৌসুমে ১ হাজার ২৮০ হেক্টর বাগান থেকে প্রায় ১০ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি মৌসুমে উপজেলাটিতে ১১ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ন টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুপারি চাষ হয় সাবরাং ইউনিয়নে।
অন্যদিকে উখিয়া কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার জানান, গত বছরের তুলনায় উখিয়ায় এবার ১৫ থেকে ২০ হেক্টর জমিতে বাগান বেড়েছে। এর মধ্যে ১০ হেক্টর বাগানে নতুন করে ফলন এসেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শুরু থেকে সুপারি সংগ্রহ শুরু হয়েছে, যা চলবে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ ৭১টি ইউনিয়নে মোট ৮ হাজার ৬৭০ একর জমিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার সুপারি বাগান রয়েছে। সুষম পরিচর্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি কম থাকায় চলতি মৌসুমে পুরো কক্সবাজার জেলা থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি সুপারি উৎপাদনের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০