
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও, প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট। এমন বাস্তবতার মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস, যার এবারের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলানো’।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে (৭ থেকে ১৭ বছর) এই হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশই কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ১৬ জন, মানসিক স্বাস্থ্য নার্স শূন্য দশমিক ৪ জন এবং মনোবিজ্ঞানী শূন্য দশমিক ৩৪ জন। বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পেছনে সেবার অপ্রতুলতার পাশাপাশি সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক পরিবার এখনো মানসিক অসুস্থতাকে রোগ হিসেবে না দেখে একে দুর্বলতা, পাগলামি বা আধ্যাত্মিক সমস্যা হিসেবে গণ্য করে। ফলে সঠিক চিকিৎসার পরিবর্তে অনেকে ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজির মতো অপ্রমাণিত পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছেন, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকারি এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে আত্মহত্যার হার ছিল প্রতি লাখে ৮ দশমিক ৭ জন। এর আগের বছর ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৮৯ এবং ২০২২ সালে ৮ দশমিক ৯৯ জন। তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের টানাপড়েন, একাকীত্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তার হার ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩১০। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে ৯৩ জন। এর মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থী ১৯০ জন, কলেজশিক্ষার্থী ৯২ জন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৭৭ জন এবং মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ৪৪ জন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সায়েদুল ইসলাম মনে করেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু মৃত্যু কমানোর দিকে নজর দিলে হবে না, বরং আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টার পর্যায়েই কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি বাংলাদেশে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে হাসপাতাল, পুলিশ ও কমিউনিটি পর্যায়ের তথ্য সমন্বয় করা হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নাগালের বাইরে আত্মহত্যার উপকরণ রাখতে হবে এবং তাদের অপরাধী হিসেবে না দেখে সহানুভূতি নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। তিনি আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার নওফল জমির বলেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যার জন্য কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তিনি এই আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, শাস্তির ভয় দেখানোর পরিবর্তে সঠিক কাউন্সেলিং ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সরকারের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি ২০২২-এ আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানোকে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০-এ কমিউনিটিভিত্তিক সেবা বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, প্রান্তিক পর্যায়ে সেবার ঘাটতি পূরণে সরকার ‘কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের অপরাধী না বানিয়ে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চিকিৎসা না পাওয়া ও সময়মত সহায়তার অভাবে বিষণ্ণতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার জটিলতা বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক বছরে সেটা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং এক মাসে এ হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে কার্যকর উদ্যোগের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোনোভাবেই তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা বা অপরাধী বানানো যাবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তীব্র বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো কিছু করার আগ্রহ ও প্রেরণা কমে যেতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০