
প্রতিরক্ষা খাতে আকাশচুম্বী অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও সৌদি আরব হুতি বিদ্রোহীদের নিক্ষিপ্ত হামলা থেকে পুরো দেশকে সুরক্ষিত রাখতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত বছর দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা তাদের সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় স্থান করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে সংগৃহীত অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে আসা নিয়মিত হুমকি সামাল দেওয়া দেশটির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি সৌদি আরব।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, গত শনিবার রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পরপরই সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৮৯টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, যার ফলে ১৪ হাজারের বেশি যাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। একইসঙ্গে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরামকো তেল স্থাপনায় আঘাত হানায় সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং রিয়াদে অন্তত চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৮৯ ফ্লাইট স্থগিত, দুর্ভোগে ১৪ হাজারের বেশি যাত্রী। টঙ্গীতে ওষুধ কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে। গত শনিবার সৌদির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা বর্তমানে এমন সব নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যেগুলো ২৫ মিনিট পর্যন্ত মাঝপথে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। তাপ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এগুলো নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করতে পারে। সিএনএনের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমির বার শালোম জানান, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের এমন সূক্ষ্ম নির্ভুলতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রযুক্তিগত নকশা ইরানের অস্ত্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের একটি সূত্রের ভাষ্যমতে, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিপুল সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় তাদের বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। হুতিরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে একই সময়ে সমন্বিত হামলা চালিয়ে সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দিচ্ছে। কৌশলগত দিক থেকে এটি ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যবহৃত সামরিক কৌশলের সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম অয়েল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আর দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা।
হুতিদের এই বর্ধিত সক্ষমতার পেছনে বাইরের সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুতিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছে। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবুও আট বছর আগেই ইরানি সহায়তা পৌঁছেছে বলে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই সংঘাতের অবসানে ইরান যদিও আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতির মতে, চলমান পরিস্থিতিতে সমঝোতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে এবং লড়াইয়ের পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতি প্রতিদিন বাড়ছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পর্যটন ও প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনার ওপর এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিয়াদে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসের মতো বড় আয়োজনেও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব নতুন করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিজস্ব মজুত এখন তলানিতে। পেন্টাগনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোলাবারুদ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে, যা মিত্রদের সহায়তা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল র্যাটনি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর অনীহা থেকে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, চরম সংকটের মুহূর্তে দেশটি হয়তো তার মিত্রদের ত্যাগ করছে। এদিকে, হুতি দমনে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় স্থল অভিযান চালানোও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে হুতিরা সেখানে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। এছাড়া, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সরকার ও সৌদি আরবের পক্ষে হুতিদের পুরোপুরি নির্মূল করা সামরিকভাবে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকেও উন্নত অস্ত্র কিনেছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবে জনজীবনেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। রিয়াদের অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার খাতিরে সন্তানদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। বিমানবন্দর হামলার পর বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু সৌদি সরকারের জন্য হুতিদের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার পথ আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে। তবে রিয়াদ এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গত সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে।
দেশটিতে চলমান আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ডেঙ্গু ও হামের মতো জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৭ জনের মৃত্যুর পর মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৭৭ জনে। এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে ১৯২০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিরক্ষা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখা সৌদি আরবের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টিকা বা ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরী।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০