থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিলাসবহুল ঘড়ির বদলে বর্তমানে ক্ষমতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে ৬০ ডলারের কম মূল্যের ক্যাসিও ঘড়ি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের নাম খোদাই করা 'ক্যাসিও এএই-১২০০ডব্লিউএইচ' মডেলের এই ঘড়িটি এখন মন্ত্রিসভার সদস্য, জ্যেষ্ঠ আমলা এবং রাজনৈতিক মিত্রদের কব্জিতে শোভা পাচ্ছে। ‘ক্যাসিও রয়্যাল’ নামে পরিচিত এই ঘড়িটি মূলত রেট্রো-ফিচারিস্টিক নকশা এবং বিশ্ব মানচিত্র প্রদর্শনের সুবিধার জন্য আলোচিত। থাইল্যান্ডের ক্ষমতা কাঠামোর ঘনিষ্ঠরা একে ‘ক্যাসিও কানেকশন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে বিলাসবহুল ঘড়ি যেখানে সামাজিক মর্যাদার একটি পরিচিত প্রতীক, সেখানে বর্তমানে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ঘড়িটির দাম ৬০ ডলারেরও কম।
একজন দক্ষ রাজনৈতিক সমঝোতাকারী হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী আনুতিন ব্যাংকক ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ বাজার থেকে এই ঘড়িগুলো সংগ্রহ করেন এবং বিতরণের আগে সেগুলোতে নিজের নাম খোদাই করিয়ে নেন। এই উপহার প্রদানের প্রক্রিয়ায় একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের ছোঁয়া দেখছেন বিশ্লেষকরা। সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো নাপন জাতুসরিপিতাক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া এই ব্যক্তিগত উপহার গ্রহীতার মধ্যে আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে। তিনি বলেন, উপহারটি প্রতিদান দেওয়ার একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে, যা গ্রহীতাকে আনুতিনের নির্দেশ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে।
উপ-পরিবহন মন্ত্রী সিরিপং আংকাসাকুলকিয়াত মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের পর আনুতিনের কাছ থেকে ঘড়িটি উপহার হিসেবে পান। তিনি জানান, এই ঘড়িটির প্রকৃত মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়, বরং যিনি এটি দিয়েছেন সেই ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের মধ্যেই এর আসল গুরুত্ব নিহিত। মজার ছলে সিরিপং আরও যোগ করেন, এই ঘড়িটি পাওয়ার পর তিনি হাজার ডলারের দামী ঘড়ি পরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। উপহারপ্রাপ্তদের মাঝে ধাতব কিংবা রেজিন ব্যান্ডের ঘড়ি পাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতাও চলে। সিরিপং নিজেও ঘড়িটি পাওয়ার জন্য বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করেছিলেন।
তবে সরকারের মুখপাত্র এক্কাপব পিয়ানপিসেস রাজনৈতিক বলয় তৈরির ধারণাটি সরাসরি নাকচ করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী কেবল ঘড়িটির ব্যবহারিক উপযোগিতা পছন্দ করেন এবং বন্ধুদের সাথে তা ভাগ করে নিতে চান। তার ভাষ্যমতে, এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই। তবে ঘটনাপ্রবাহ বলছে ভিন্ন কথা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা থামানাত প্রোমপো, যার দল আনুতিনের জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তার হাতেও এই ঘড়িটি দেখা গেছে। দলের মহাসচিব ইঙ্গিত দিয়েছেন, আনুতিন সরাসরি নিজের হাত থেকে খুলে তাঁকে ঘড়িটি দিয়েছেন, যা জোট গঠনের গুঞ্জনকে আরও জোরালো করেছে।
থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে আনুতিনের এই কৌশলকে বন্ধু ও অনুসারীদের নিয়ে নিজস্ব একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অনাড়ম্বর চেহারার এই ক্যাসিও ঘড়িগুলো বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ‘কোয়াইট লাক্সারি’ বা অনাড়ম্বর বিলাসী পণ্যের ধারারই এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ ও সস্তা পণ্য যখন ক্ষমতার শীর্ষ মহলের পছন্দের তালিকায় উঠে আসে, তখন তা সম্পদ বা রুচির চেয়েও বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ারই বারতা বহন করে। এই ঘড়িগুলো সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কেরই প্রতিফলন, যা আনুতিনকে গত কয়েক দশকের মধ্যে থাইল্যান্ডের অন্যতম স্থিতিশীল সরকার গঠনে সহায়তা করেছে। সাধারণ বা অনাড়ম্বর চেহারার এই ক্যাসিও ঘড়িগুলো সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে চলমান একটি নতুন ধারার প্রতিফলন—যেখানে কম দামি বা সাধারণ কোনো বস্তুও সম্পদ, রুচি কিংবা বিশেষ কোনো মহলে প্রবেশের সুযোগের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। ‘কোয়াইট লাক্সারি’ বা। নাপন বলেন, “ওই ঘড়িগুলোর মাধ্যমে আনুতিনি নিশ্চিতভাবেই বন্ধু, অনুসারী এবং নিজস্ব একটি গোষ্ঠী বা বলয় গড়ে তুলছেন। ”।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০