
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন যে, ইসরাইল বর্তমানে ভয়ংকর মাত্রার যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করছে এবং দেশটি একটি আঞ্চলিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে তিনি সতর্ক করেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মানবিক সংকটকে আরো গভীর করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে জর্ডানের বাদশাহ বলেন, লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও ইরানে চলমান সংঘাতের রেশ সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাই থেকে মাদ্রিদ বা যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের ব্যয়ে যুদ্ধের এই অস্থিতিশীলতা প্রভাব ফেলে। রাজা আবদুল্লাহ মনে করেন, বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের একটি অনন্য মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কোন সংঘাত বিশ্ববাসীর মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কোন সংঘাত নিয়ে বিশ্ব দীর্ঘ সময় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে, কোন যুদ্ধবিরতি ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরও টিকে থাকবে এবং মানবিক দুর্ভোগ কখন অসহনীয় থেকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হবে—এসবের ওপর আন্তর্জাতিক মনোযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরান যুদ্ধের এই অস্থিতিশীলতা অঞ্চলটির বাইরেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষের জীবনযাত্রায় দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজা প্রসঙ্গে রাজা আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, কয়েক দশক ধরে তিনি এই মঞ্চে সমাধান না হওয়ার বিপদ নিয়ে সতর্ক করে আসলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা গুরুত্বের সাথে নেয়নি। ঘোষিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ৩০০ দিনে অন্তত ৩০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি ইসরাইলি সরকারকে গাজায় বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস ও সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির দায়ে অভিযুক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, গাজার ফিলিস্তিনিরা এখন সীমিত ভূখণ্ডে আবদ্ধ এবং ইসরাইল সেখানে নতুন ভৌগোলিক বাস্তবতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। রাজা আবদুল্লাহ বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে গাজার ফিলিস্তিনি জনগণ উপত্যকার মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বাধা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও তিনি করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাতের মূল কারণ সমাধানের পরিবর্তে সেটিকে শুধু ‘পরিচালনা’ করার পথ বেছে নিয়েছে।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে জর্ডানের রাজা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা এই সহিংসতায় প্রত্যক্ষ সহায়তা করছে বা নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনিদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে, অন্যথায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা চিরতরে মুছে যাবে। প্রতিদিনই নতুন সংকট, ট্র্যাজেডি ও জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে।
শান্তি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গে রাজা আবদুল্লাহ ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের সঙ্গে শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি আরব বিশ্ব, বরং ইসরাইলি সরকারের অনিচ্ছাই শান্তির পথে বড় বাধা। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খোলা থাকলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিরিয়ার পরিস্থিতিকে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে রাজা আবদুল্লাহ বলেন, ইসরাইলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু ফিলিস্তিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জর্ডান ন্যায্য শান্তির অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হবে না এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় অটল থাকবে। জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা রক্ষায়ও তার দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সবশেষে রাজা আবদুল্লাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান যেন গাজা, সুদান বা ইউক্রেনের মতো পরিস্থিতিতে তারা নীতিগত অবস্থানে অবিচল থাকে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভবিষ্যৎ কেবল আমাদের কাজের ওপর নয়, বরং আমরা কোন বিষয়গুলো উপেক্ষা করছি তার ওপরও নির্ভর করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০