
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। খরা, বন্যা ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে অন্তত ৯ কোটি মানুষ আজ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আসন্ন কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর নতুন এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের প্রাক্কালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মতো তীব্র জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে অবস্থান করছেন। ইউএনএইচসিআর-এর সহকারী হাইকমিশনার (অপারেশন্স) অ্যান্টন লেইস গার্সিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, সংঘাত ও সংকটপূর্ণ এলাকায় জলবায়ু অভিযোজন কেবল একটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয়, বরং এটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য শর্ত। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অর্থায়ন যেন সঠিক সময়ে সেই জায়গাগুলোতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবেদনে সুদানের আল-ফাশির থেকে পালিয়ে ২০২৩ সালের জুনে চাদের ফারচানা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক সুদানি নাগরিকের জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহে স্থানীয় নদী ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় ওই ব্যক্তি খাবার পানির সন্ধানে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে বাধ্য হন। অনেক সময় পুরো এক সপ্তাহেও তিনি নিরাপদ পানির নাগাল পান না। এছাড়া ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন সব দেশে গিয়েছেন, যা তীব্র জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ফলে তাদের পুনরায় বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেমন, সম্প্রতি সিরিয়ায় ফিরে যাওয়া প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ পানিসংকট ও অনিয়মিত বৃষ্টির শিকার হচ্ছেন। গত মে মাসে ইউফ্রেটিস নদীর বন্যায় সেখানে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রতি তিনটি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে অন্তত একটিতে বছরে ১০০ দিন প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। ইথিওপিয়ার হেলাওয়েনের মতো কিছু শিবিরে এই উত্তাপ বছরে ২০০ দিন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে হিটস্ট্রোক ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা, পানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে এই তীব্র গরম থেকে রক্ষা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে জলবায়ুজনিত বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। এছাড়া আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সম্পদের সংকট নিয়ে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে এবং এশিয়ার বিভিন্ন অংশেও ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার প্রকোপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ১০ শতাংশের মতো অর্থ বর্তমানে ভঙ্গুর ও সংঘাতকবলিত দেশগুলোতে পৌঁছায়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। তুরস্কের কপ৩১ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের এই অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। কার্যকর অভিযোজন ও পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত না হলে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০