
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ সম্মেলনটি চলবে। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক এই সংলাপে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ২শ’ বক্তা, ৩শ’-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞগণ অংশ নিয়েছেন। অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সকল খাতে আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই।’ বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেবে। স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য পরিবেশ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন। আমরা চাই আমাদের তরুণেরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।’।
দেশের সুবিধাভোগী মানুষের কল্যাণে সরকারের নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজিয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এতে অগ্রাধিকার পান।’ তিনি আরও জানান, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এই উদ্যোগটি মূলত সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। এছাড়া দেশের কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সহায়তা কার্যক্রম গতিশীল করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা তৃণমূল মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও উল্লেখ করেন যে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। মা ও নবজাতকের যত্নে বিশেষ স্বাস্থ্য সুবিধা প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও রূপান্তরের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করারও মাধ্যম হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’ শিশুদের চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের চরিত্র গঠনে পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।’ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপরে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।’ একই সাথে দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা, উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।’ এ লক্ষ্যে সরকার ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
কৃষিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করা হচ্ছে।’ কৃষকের ফসল যাতে ন্যায্য মূল্যে বাজারে বিক্রি হতে পারে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উৎপাদন দ্বিগুণ করা যায়, সে ব্যাপারে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুলের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’ এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি ব্যবহার করে ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের শীর্ষ ১শ’টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে রয়েছে।’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব।’ বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ ও sovereignty বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সকলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কারও সাথে বৈরিতা নয়—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করতে হবে ‘যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে।’ পারস্পরিক বিভেদ ভুলে অভিন্ন কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার মাধ্যমেই এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০