
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে এক গৃহবধূ ও তার দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জেলা পুলিশ রহস্য উদঘাটনে তৎপর হয়েছে। ১৮ অক্টোবর রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যার মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বালুপাড়ার ঘটনাটি ঘটে। এলাকায় এ নিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনার পরই গৃহবধূর স্বামী শাকিল হোসেন (২৬), শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন (৫০) ও শাশুড়ি রহমত আলা তারা বিবি (৪২)-কে হেফাজতে নিয়েছে। নিহতের বাবা খাইরুল ইসলাম সোমবার দুপুর ১২টায় বাদী হয়ে তিনজনের নামে থানায় এজাহার দায়ের করলে পুলিশ মামলাটি রুজু করে। রাতে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বামী শাকিল নিজেই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। শিশু দুটিকে হত্যা করার আলামত মিললেও গৃহবধূ নিজে আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, শিশু দুটিকে কে হত্যা করেছে- এ রহস্য রোববার দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি গত ১৮ অক্টোবর রোববার দুপুর আড়াইটা হতে সন্ধ্যা ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কোনো এক সময় উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের জুগির ডাঙ্গা মাঠের পূর্ব পাশে মোস্তফাপুর বালুপাড়ায় ঘটেছে। সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে শাকিল হোসেনের (২৬) সঙ্গে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ি এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের (২০) সঙ্গে গত সাড়ে ৩ বছর পূর্বে প্রেমের সূত্র ধরে বিয়ে হয়। স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মাদকসেবন করা নিয়ে মাঝেমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর বাগবিতন্ডাসহ টুকটাক ঝগড়া-বিবাদ থাকত। বোন আত্মহত্যা করেছে নাকি স্বামী মেরে ফেলেছে, ঘটনাটি বুঝতে পারছি না। শাকিল যেন না ছোয়, বাবা-মা সরি। ‘আই লাভ ইউ’ চিহ্ন ছিল।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ গৃহবধূর স্বামী শাকিল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন দুপুরে অটো নিয়ে বের হওয়ার সময় স্ত্রী বাবার বাড়ি যাওয়ার টাকা চেয়েছিলেন। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে স্বামী শাকিল অটো চালাতেন।
শাকিল পরের দিন টাকা দেওয়ার কথা বললে স্ত্রী রাগ করেন।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে দরজা না খোলায় টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে স্ত্রীকে ঝুলন্ত ও সন্তানদের নিথর অবস্থায় দেখতে পান বলে তিনি দাবি করেন। সংবাদ পেয়ে দ্রুত জামাইয়ের বাড়িতে আসি।
শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন জানান, মজুরি কাজ থেকে ফিরে সাড়া না পাওয়ায় তিনি বেড়া ভেঙে ঘরে ঢোকেন এবং তাদের উদ্ধার করেন। যদিও মৃত গৃহবধূর মা আনজু আরা জানান, তিন মাস আগে তার মেয়ে শাকিলের মাদকাসক্তি ও নির্যাতনের কথা তাকে জানিয়েছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আমিন শাহ জানান, ঘরের দেয়ালে একটি লেখা পাওয়া গেছে যা ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে। ওই লেখায় পারিবারিক সমস্যার ইঙ্গিত থাকলেও কে বা কারা সেটি লিখেছে তা তদন্তাধীন রয়েছে। এরপর লাশগুলো উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। ভাত খাওয়ার সময় ছেলের বউ, নাতি-নাতনি কারো কোনো সাড়া না পাওয়ায় অনেক ডাকাডাকি করি। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসে ও আমার স্ত্রী নাতি-নাতনি দুটোকে কোলে নিয়ে কান্না শুরু করে।
সিআইডির ক্রাইম বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হালিম, থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবীসহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ময়নাতদন্তের জন্য সোমবার দুপুরে মরদেহগুলো দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে গৃহবধূর নিজের আত্মহনন নাকি তৃতীয় পক্ষের কোনো যোগসূত্র রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন।
ঘটনাস্থল ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত মোটিভ উদঘাটনে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট মাঠে কাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে। এদিকে, মৃত গৃহবধূর বড় ভাই শাহানুর সজীব জানিয়েছেন, ঢাকায় থাকলেও তিনি ঘটনার আগের দিন পর্যন্ত ওই বাড়িতেই ছিলেন, কিন্তু কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তার নজরে আসেনি। স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের ভাষ্যমতে, পরিবারটির পক্ষ থেকে অতীতে কোনো ঝগড়া-বিবাদের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলের দেয়াললিখন এবং শাকিলের স্বীকারোক্তি তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মামলাটি রুজু হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পুলিশ ঘটনার অধিকতর অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। মৃত গৃহবধূর আপন বড় ভাই ও শাকিলের আপন ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, আমি বিয়ের পর হতে ৬ বছর এই বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া ঘরে থাকতাম। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটিতে এসে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার এই বাড়িতেই ছিলাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০