
ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে জুমার নামাজের খুতবা অভিন্ন করার এক বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াকফ বোর্ড। এই সিদ্ধান্তের জেরে পুরো উপত্যকার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে চরম অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের জোরালো অভিযোগ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা।
ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দারাখশান আন্দ্রাবি সম্প্রতি এই পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই নেত্রীর দাবি ছিল, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা বা মানসিক স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক সংকটগুলো মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে খুতবায় নির্দিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গত রোববার এই বিষয়ে আলোচনার জন্য কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ধর্মীয় বক্তাকে তলব করেছিল ওয়াকফ বোর্ড। গত রোববার ওয়াকফ বোর্ড কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় এক হাজার ৫০০ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ধর্মীয় বক্তাকে তলব করেছিল।
তবে এই তলব ও প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শ্রীনগর থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি জেলা রাজৌরি থেকে অনলাইনে সভায় অংশ নেওয়া একজন আলেম জানান, বোর্ড থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে জুমার নামাজে কেবল একটি নির্দিষ্ট খুতবাই পাঠ করতে হবে, যা আগে থেকেই কোনো একটি কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুত ও অনুমোদিত থাকবে। তবে এই কমিটির সদস্যদের পরিচয় বা স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় এই নেত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত। কিছু নেতা সশরীরে উপস্থিত থাকলেও অনেকে ভার্চুয়ালি এই সভায় অংশ নেন।
কাশ্মীরের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ ওমর ফারুক এই উদ্যোগকে সরাসরি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতোই সাবেক রাজনীতিক নাঈম আখতার এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অগ্রহণযোগ্য। আখতারের মতে, ওয়াকফ বোর্ডের কাজ মূলত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা তাদের এখতিয়ারের বাইরের বিষয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ করার কল্পনাও করা যায় না। ইসলামি আইন অনুযায়ী মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তি বা ওয়াকফ বিষয়াবলি তদারকি করা এই বোর্ডের কাজ। নাঈম আখতার আল জাজিরাকে বলেন, ‘মধ্যযুগে সুলতান বা খলিফার নামে কেন্দ্রীয়ভাবে খুতবা বা ধর্মোপদেশ দেওয়া হতো।
২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর থেকেই অঞ্চলটির ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় আইনের প্রভাব ও সরকারি হস্তক্ষেপের প্রবণতা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এর আগে মসজিদগুলোর ইমাম ও ধর্মীয় কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিধিনিষেধ আরোপ এবং সুফি ঐতিহ্যের অনুদান সংগ্রহের ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের মতো একাধিক বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে। তার দাবি, পূর্বানুমোদিত খুতবা মসজিদে পাঠের বিষয়ে আপত্তি জানালে তাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়।
তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত ওয়াকফ প্রধান আন্দ্রাবি তার অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। তিনি জানিয়েছেন, সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনার বিষয়টি এখন স্বাধীন আলেম ও ধর্মীয় বক্তাদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অঞ্চলটির বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মসজিদের মতো সংবেদনশীল স্থানে সরকারি যেকোনো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সহজেই অবিশ্বাসের জন্ম দেয়, যা বিজেপির মুসলিম নীতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে থাকা বিদ্যমান উদ্বেগকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০