
ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকা দখল করে রাখা হুথি বিদ্রোহীরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা, ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী। তাদের সাম্প্রতিক এসব হামলার ফলে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতি নতুন করে সামনে এনেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কারা হুথি, কেন সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং কীভাবে সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা সৌদি আরবের জন্যও এই গোষ্ঠীকে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়ার দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি সঠিকভাবে তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে যে, দক্ষিণ-পশ্চিম সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতেও তারা সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটিকে তারা আকাশপথেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। রাজধানী পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্রের পৌঁছানোর ঘটনাটি সৌদি কর্তৃপক্ষ গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।
হুথি আন্দোলনের মূলে রয়েছে এক জটিল সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের একটি পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে এদের উত্থান ঘটে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবহেলিত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই সম্প্রদায়ের মানুষের অসন্তোষ থেকে সংগঠনটির জন্ম। গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘আনসারুল্লাহ’ হিসেবে পরিচয় দেয়, আর তাদের নামের ভিত্তি হলো এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথি। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ১৯৯০-এর দশকে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। একসময় ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত বোধ করতেন। সেই অসন্তোষ থেকেই ধীরে ধীরে সংগঠিত হয় হুথি আন্দোলন।
২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারিত করে এবং ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়। ২০১৫ সালের শুরু থেকে সৌদি আরব ও তার মিত্র দেশগুলো হুথিদের দমন করে সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। এরপর ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও উত্তরের শক্ত ঘাঁটির কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দীর্ঘ সামরিক অভিযানেও হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়িয়ে তারা সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি হলেও ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত আবারও তীব্র রূপ নিয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর থেকে হুথিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও ইসরায়েল অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে নেওয়া রাজনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার বিরোধিতা করে তারা।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই জলপথের কৌশলগত পেরিম দ্বীপ ও মোখা বন্দর দখলের দাবি করেছে হুথিরা। এই জলপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ফলে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যকার পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের অর্থনীতির একটি বড় অংশ তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই হামলাগুলো রিয়াদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের সশস্ত্র সদস্যসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ। তাদের হাতে ট্যাংক, ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ইয়েমেন থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানার সক্ষমতা তাদের আঞ্চলিক প্রভাবকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে যে, ইরান অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে হুথিদের সহায়তা করে এবং এতে লেবাননের হিজবুল্লাহরও ভূমিকা রয়েছে। যদিও হুথিরা সরাসরি ইরানের প্রক্সি বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি হওয়ার দাবিটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতেই তাদের সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করে। তবে প্যালেস্টাইন-২ ও তুফান ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রের সাথে ইরানি নকশার মিল খুঁজে পায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। গোষ্ঠীটি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে নিজেদের কর্তৃপক্ষ হিসেবে মান্য করে না, যা তাদের সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে।
বর্তমানে সৌদি আরবের মতো সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশের জন্যও ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতিতে হুথিদের নির্মূল করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তারা বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহারে পটু, যা প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। বুরকান, বদর থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক প্যালেস্টাইন-২ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ হুথিদের সামরিক অবস্থানকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০