
২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র সাড়ে তিন বছর বাকি। টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, ১৬৭টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১১০তম এবং অর্জিত স্কোর ৬৪ দশমিক ৮৪। গত বছরের তুলনায় এ চিত্র আরও উদ্বেগের, কারণ পরিমাপযোগ্য অভীষ্টগুলোর মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে দেশ সঠিক পথে রয়েছে, বিপরীতে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
দেশের উন্নয়নের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে দুটি বড় পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যা বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি মাত্র ১০টি ব্যাংকের দখলে। এই সংখ্যাগুলো প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র যেমন নাগরিকের থেকে ন্যায্য রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ, তেমনি সংগৃহীত আমানত ও সম্পদ রক্ষাতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
উন্নয়নের পথে আমাদের মূল ঘাটতি লক্ষ্যের নয়, বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর যারা পরিকল্পনাকে ফলাফলে রূপান্তর করে। ২০২৫ সালের স্বেচ্ছা জাতীয় পর্যালোচনাতেই স্বীকার করা হয়েছে যে, কর্মসংস্থানের ৮৪ দশমিক ১ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক এবং ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের বাইরে। একইসঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া গত এক দশকে প্রতিবছরই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে, যার পরিমাণ সর্বশেষ অর্থবছরে ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
ইসলামি দর্শনে 'মাকাসিদ আল-শরিয়াহ' বা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে এসডিজির সামঞ্জস্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুধা মুক্তি ও পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয়গুলো উভয় দর্শনেরই কেন্দ্রবিন্দু। তবে কেবল সূচকে ভালো নম্বর পাওয়া আর সক্ষমতা বৃদ্ধি এক নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এলেও আয়বৈষম্যের গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৪৯৯-এ পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, সম্পদের বৃদ্ধি ঘটলেও তা সুষমভাবে বণ্টিত হয়নি, যা কোরআনের সুরা হাশরের (৫৯:৭) নির্দেশনার পরিপন্থী—যেখানে সম্পদ কেবল ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জরুরি
ইসলামি সামাজিক অর্থায়ন যেমন জাকাত, ওয়াক্ফ ও সামাজিক সুকুক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২০ সাল থেকে সরকারি সুকুকের মাধ্যমে ৫৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এগুলো রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের বিকল্প নয়। ওয়াক্ফ সম্পত্তির তালিকা হালনাগাদ করা এবং জাকাত ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমানত রক্ষা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচারের যে শিক্ষা শরিয়ত দেয়, তার যথাযথ প্রতিফলনই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি হওয়া উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, ১৬৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১০তম, স্কোর ৬৪ দশমিক ৮৪। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগের বছরের সংস্করণ আরও নির্দিষ্ট কথা বলেছিল: পরিমাপযোগ্য অভীষ্টগুলোর মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশে আমরা লক্ষ্যপথে আছি, আর ৩৫ দশমিক ১ শতাংশে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই সংখ্যাগুলোর পাশে আরও দুটি সংখ্যা রাখুন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম সংখ্যাটি বলে, রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে ন্যায্য অংশ তুলতে পারছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্বিতীয়টি বলে, যা তোলা হয়েছে বা জমা রাখা হয়েছে, তার রক্ষণাবেক্ষণেও আমরা ব্যর্থ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুটিই আদতে একই জিনিসের পরিমাপ—আমানত, অর্থাৎ অন্যের সম্পদ ও অধিকার বিশ্বস্তভাবে রক্ষা করার দায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমার যুক্তি সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর: বাংলাদেশের ঘাটতি লক্ষ্যের নয়, ঘাটতি নৈতিক ভাষারও নয়; ঘাটতি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর, যারা লক্ষ্য ও ভাষা দুটিকেই ফলাফলে রূপান্তর করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসডিজি: সংলাপ থেকে বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলো কতটা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০