
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী দেশে করদাতার সংখ্যা ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। করদাতার জন্য শুধুমাত্র রিটার্ন জমা দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য ও ফরম ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তা দাখিল করা জরুরি। অন্যথায় রিটার্নটি অসম্পূর্ণ বা অকার্যকর হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আইনে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাংলা ভাষায় পাঠদানকারী প্রাথমিক বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রয়েছে। এছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষায় পাঠদানকারী প্রাথমিক বা প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাসিক পেমেন্ট আদেশভুক্ত (এমপিও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—যদি তাদের ইংরেজি ভার্সন কারিকুলাম না থাকে। কোনো আইন বা সরকারি আদেশে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা, কর্তৃপক্ষ, কমিশন, ইনস্টিটিউট, বোর্ড, একাডেমি বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান, যারা কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে না এবং পরিচালন ব্যয়ের আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থ সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত পায়, তারাও এই ছাড়ের আওতায় পড়ে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় রয়েছে। যেমন—৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা (প্রয়োজনীয় সনদ দাখিল সাপেক্ষে), শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক, মৃত করদাতার আইনি প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন। এছাড়া ই-রিটার্ন সিস্টেমে টেকনিক্যাল বা নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কেউ অনলাইনে রিটার্ন দিতে না পারলে, সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। আয়কর রিটার্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানি, কোনো কোম্পানির অংশীদার-পরিচালক বা অংশীদার-কর্মচারী, ফার্ম, ফার্মের অংশীদার, ব্যক্তিসংঘ, ব্যবসায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকের পদধারী কর্মচারী, গণকর্মচারী এবং বাংলাদেশে স্থায়ী স্থাপনা রয়েছে, এমন অনিবাসী ব্যক্তি।
স্বাভাবিক ব্যক্তি ব্যতীত অন্যান্য শ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের ১৬৯ ধারা অনুযায়ী বোর্ড নির্ধারিত ফরমে রিটার্ন জমা দিতে হবে। মূল ফরমের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তফসিল, বিবরণী ও হিসাবপত্র যুক্ত করা আবশ্যক। আইনের ৭৩ ধারা অনুযায়ী যেসব করদাতার নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাদের রিটার্নের সঙ্গে নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী, বোর্ড নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণের প্রমাণপত্র, আয় পরিগণনাপত্র এবং উৎসে কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ জমা দিতে হবে। কোনো করদাতার সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে আন্তর্জাতিক লেনদেন থাকলে তাকে ২৩৮ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত আন্তর্জাতিক লেনদেনের বিবরণীও দাখিল করতে হবে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭ো ধারা অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি বা হিন্দু যৌথ পরিবার করদাতা রিটার্ন দাখিল করলে তারা পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ করছাড় বা প্রণোদনা পাবেন, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। তবে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কোনো কর প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। এর বিপরীতে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে বিলম্বিত রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ওপর ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা (যেটি বেশি) অতিরিক্ত কর দিতে হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিলে এই অতিরিক্ত করের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
করবর্ষ অতিবাহিত হওয়ার পর করদাতার স্বপ্রণোদিত রিটার্ন কিংবা নোটিশের বিপরীতে জমা দেওয়া রিটার্নকে ১৭৪ ধারা অনুযায়ী 'বিলম্ব রিটার্ন' হিসেবে গণ্য করা হয়। করবর্ষ শেষ হওয়ার পর নোটিশের মাধ্যমে বিলম্ব রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকা (যেটি বেশি) অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া বিলম্ব রিটার্নের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ১-এর চাকরি বা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের করমুক্ত আয় ছাড়া অন্যান্য আয়ের বিপরীতে কোনো কর অব্যাহতি সুবিধা পাওয়া যাবে না।
রিটার্ন দাখিল করার পর কোনো ভুল নজরে এলে আয়কর আইনের ১৭৫ ধারা অনুযায়ী সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যায়। স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্নে করদাতা নিজে ভুলত্রুটি খুঁজে পেলে, কর ফাইল অডিটের সময়, উপ-কর কমিশনার কর্তৃক কর নির্ধারণের সময় কিংবা কর আপিল ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যাবে। তবে এই সুযোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়; মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় বা তার আগে প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে।
আইনের ১৭৬ ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন বা সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় বোর্ডের নির্দেশনা বা আইন অমান্য করা হলে তা অসম্পূর্ণ রিটার্ন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে উপ-কর কমিশনার করদাতাকে ঘাটতি পূরণের জন্য নোটিশ দেবেন। করদাতা যদি নোটিশের নির্দেশ পুরোপুরি পালন না করেন, তবে রিটার্নটি বাতিল বা অকার্যকর বলে গণ্য হবে, অর্থাৎ ধরে নেওয়া হবে তিনি রিটার্ন দাখিলই করেননি। তবে করদাতা নির্দেশ অনুযায়ী সব তথ্য ও দলিল সরবরাহ করলে রিটার্নটি মূল দাখিলের তারিখ থেকেই সম্পূর্ণ বলে গণ্য হবে। শুধু প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পাওয়া মানেই রিটার্নটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নয়, তা মনে রাখা প্রয়োজন। এমনকি রিটার্ন জমা দিয়ে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র হাতে পাওয়ার পরও সেটি আইনের চোখে সম্পূর্ণ নাও হতে পারে, এই বাস্তবতাও অনেকের অজানা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০